আমেরিকান মুসলমানরা রমজানের শিক্ষায় কোভিড -১৯ মোকাবেলা করছে

ডাঃ হায়দার আল-সাদী ডেট্রয়েট শহরতলীর এক হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্‌সা করছেন। (ছবি: ডাঃ হায়দার আল-সাদীর সৌজন্যে)
শেয়ারআমেরিকা 
ডেভ রেনল্ডস – ১৪ মে, ২০২০

 

ডেট্রয়েট-অঞ্চলের একটি জরুরি চিকিত্‌সা কেন্দ্রে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্‌সা করার চাপ সামলানো এখন ডাঃ হায়দার আল-সাদীর রোজা পালনের অংশ হয়ে গিয়েছে। সেহরি থেকে ইফতার (ভোর থেকে সন্ধ্যা) পর্যন্ত রোজা রেখে ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত থাকা অবস্থাতেই ১০ ঘণ্টার শিফটে রোগীদের চিকিত্‌সা দেয়ার সময়টা তাঁকে মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাসে অন্যকে সেবাকে করার শিক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়।

ডাঃ হায়দার আল-সাদী ডেট্রয়েট শহরতলীর এক হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্‌সা করছেন। (ছবি: ডাঃ হায়দার আল-সাদীর সৌজন্যে)

“আপনি নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেবেন এই সময়টি হলো ধৈর্য ধরার এবং কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে তাকানোর এবং মানুষকে সাহায্যের জন্য নিজের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করা,” বলছিলেন মাত্র ১ মাস বয়সে ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ৩৮ বছর বয়স্ক ডাক্তার সাদী, “একজন মুসলমান হিসেবে, ইসলাম ধর্ম থেকে আমরা এই শিক্ষাই পাই।”

তিনি মিশিগানের ফার্মিংটন হিলসের বিউমন্ট হাসপাতালে চিকিৎসকদের একটি ছোট দলের অংশ হয়ে কাজ করেন। মার্চ মাসের শেষের দিকে ডেট্রয়েটের শহরতলীতে কোভিড-১৯ যখন সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছেছিল সেসময়ে ডাঃ সাদী প্রতিদিন ২৫০-৩০০ জন কোভিড-১৯ রোগীকে চিকিত্‌সা করেছেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হাসপাতালের আইসিইউ-তে কর্মরত, ডাঃ মুনা বেগের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় বের করতে পারা খুবই কঠিন। তাই কোভিড-১৯ সহ অন্যান্য রোগীদের চিকিত্‌সা করতে গিয়ে কোন একটি ওয়াক্তে নামাজ পড়তে না পারলে তিনি পরের ওয়াক্তে কাজা নামাজ আদায় করে নেন।

“আমার মা আমাকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে শেখাতে গিয়ে সবসময় বলেছেন সৃষ্টিকর্তা নিষ্ঠুর নন,” লস এঞ্জেলস টাইমসকে দেয়া সাক্ষাতকারে ডাঃ মুনা বেগ বলছিলেন, “সুতরাং আপনি যে পরিস্থিতিতেই থাকুন না কেন আপনাকে সেই পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে।”

তিনি নামাজ পড়ার সময় নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর নোংরা হওয়া এড়াতে চেয়ারে বসে নামাজ পড়েন।

মুসলমানরা ঐতিহ্যগতভাবে রমজান মাসে তাদের দাতব্য কর্মকান্ড বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে থাকে। কোভিড-১৯ তাদের এই ঐতিহ্যে পরিবর্তন আনতে পারেনি।

মার্চ মাসে ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ যাকাত বিষয়ক কর্মকান্ডে নিয়োজিত শিকোগোভিত্তিক এনজিও যাকাত ফাউন্ডেশন শিকাগোর হাসপাতালগুলোতে কয়েক হাজার রোগী পরীক্ষা করার গ্লাভস সরবরাহ করেছে। সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিভিন্ন হাসপাতালে কমপক্ষে ১ লাখ রোগী পরীক্ষার গ্লাভস বিতরণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার ইসলামিক সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবীরা ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে ৯ এপ্রিল খাবার বিতরণ করেছে। (© পল হেনেসি / নূরফটো/গেটি ইমেজেস)

অলাভজনক সংস্থা আমেরিকান মুসলিম হেলথ প্রফেশনালস যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৩ এপ্রিল শুরু হওয়া রমজান মাসের শুরুতেই সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, “(রমজান হলো) আধ্যাত্মিক শুদ্ধি ও সমাজসেবার সময়” এবং দেশে-বিদেশে মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সকলকে দান করতে উত্‌সাহিত করেছে।

ওমর ইশরাক, যিনি সম্প্রতি চিকিত্‌সা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদ থেকে অবসর নিয়েছেন, তিনি কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্‌সায় সহায়তা দিতে ভেন্টিলেটর উত্‌পাদন দ্রুততর করার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা জুনের মধ্যে ভেন্টিলেটর উত্‌পাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে সপ্তাহে ১ হাজারের বেশি ভেন্টিলেটর তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এছাড়াও মেডট্রোনিক যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য দেশে ভেন্টিলেটর উত্‌পাদন এবং চিকিত্‌সা পেশাজীবীদের ভেন্টিলেটর ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রেও সহায়তা করছে।

“সবাইকে রমজান মোবারক” জানিয়ে ২৪ এপ্রিল এক টুইট বার্তায় ইশরাক লেখেন, “আত্মশুদ্ধি ও প্রার্থনার মাস রমজানে আসুন আমরা অন্যকে সাহায্য করার আমাদের প্রচেষ্টাকে দ্বিগুণ করি।”

ডাঃ আল-সাদীর জন্য কোভিড-১৯ মহামারীর এই সময়ে রমজান মানে হলো বাড়িতে ফিরে প্রিয় সন্তানদের কিংবা মুদি বাজার সদাই পৌঁছে দিয়ে প্রিয় মা-বাবাকে আগের মতো আলিঙ্গন ও চুম্বন না করা। একজন মুসলমান হিসেবে তিনি তাঁর ধর্ম চর্চা অব্যাহত রেখেছেন হাসপাতালের জরুরি সেবা কক্ষে রোগীদের সেবা দেয়ার মাধ্যমে।

“রমজান মাস প্রতিবছর আমাদেরকে নিজের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়,” বলছিলেন রোজার মাসে কর্মক্লান্ত ডাঃ সাদী, “নিজেকে শুদ্ধ করে… (ধর্ম) বিশ্বাসকে মজবুত করে এগিয়ে যাওয়ার এটাই সময়।”