ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এর বার্ষিকী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত মিলারের মন্তব্য

মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন,
মাননীয় মেয়র মোঃ আতিকুল ইসলাম,
সম্মানিত অতিথিবৃন্দ,
এই স্মরণীয় মুহূর্ত উদযাপনে আপনাদের সাথে থাকতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি।

পঞ্চাশ বছর আগের এই মাসে বাংলাদেশ এক অস্তিত্বের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলো। সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন জাতি আত্মপ্রকাশ করেছিল।

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি’র বক্তব্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের ইতিহাসের মধ্যে বহু মিল রয়েছে।

তিনি বলেছিলেন:

আপনাদের এখানে যেমন ছিলো, তেমনি এক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠিত সরকার আমাদের স্বাধীনতাকেও দমিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলো।

আপনাদের মতোই আমাদের পূর্বসূরি নেতৃবৃন্দ তাঁদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভয়ানক কষ্ট সহ্য করেছেন।

আপনাদের মতোই যখন নতুন আমেরিকান জাতি আত্মপ্রকাশ করলো তখন একদল বলতে শুরু করলো, এরকম একটি দুর্বল দরিদ্র দেশ আধুনিক বিশ্বে টিকতে পারবে না।

 তারা ভাবলো, এই কঠিন পরীক্ষায় আমরা নিশ্চিত অকৃতকার্য হবো।

 কিন্তু আমরা তাদের সকল ভবিষ্যদ্বাণীকে ব্যর্থ করে এসেছি। আমরা সবকিছুতেই দরিদ্র ছিলাম, তবে আশা সাহসিকতায় ছিলাম শক্তিশালী।

 আমাদের সম্পত্তি ছিলো না, তবে যে সম্পদ আমাদের ছিলো, তা ছিলো আরো বেশী মূল্যবান গুরুত্বপূর্ণ।

 দেশকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য আমাদের ছিলো উদ্যমী অঙ্গীকারবদ্ধ জনগণ এবং আরো ছিলো সেই পথ দেখার মতো মানুষকে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা দেবার মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃবৃন্দ।

গত পাঁচ দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী শক্তিশালী সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।

আমাদের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২০১৯ সালে নয় বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড করেছে । বাংলাদেশী পণ্যের একক রপ্তানীস্থল হিসেবে বৃহত্তম দেশ এবং বাংলাদেশে বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের সর্ববৃহৎ উৎস যুক্তরাষ্ট্র।

বাংলাদেশের উন্নয়নে দেশের বৃহৎ নদীগুলোর তলদেশ খননে সহায়তা থেকে শুরু করে নতুন প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের সূচনা ও দূষণহীন জ্বালানীর বিপ্লব ঘটানো এবং বাণিজ্য ও ভ্রমণ ত্বরান্বিত করতে বিশ্বমানের বিমান ও রেলইঞ্জিন সরবরাহ পর্যন্ত বহু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পেরে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো গর্বিত।

আমি গর্বিত যে, বাংলাদেশে আমেরিকান কোম্পানিগুলো আদর্শ ব্যবসায়ী সমাজের অংশ। হোক সেটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কোকা-কোলা কর্তৃক নির্মিত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সহিষ্ণু বিদ্যালয় নির্মাণ অথবা মাস্টারকার্ড কর্তৃক ১০০,০০০ নারী উদ্যোক্তাকে আর্থিক  ও ব্যবসা দক্ষতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান, ব্যবসায়ী হিসেবে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমগুলো বাংলাদেশের মানুষের নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য আরো ভালো জীবনমান অর্জনে সহায়ক হবে।

বিভিন্ন জরুরী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ বহু দশক ধরে একসাথে কাজ করে আসছে। গত বিশ বছরে স্বাস্থ্য সহায়তা হিসেবে ১ বিলিয়ন ডলারসহ বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান বাড়াতে স্বাধীনতার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে।

বাংলাদেশের সকল শিশুর জন্য উচ্চমানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাপুষ্ট শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় ৫,০০০’রও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৩ লক্ষ শিশু সহায়তা পেয়েছে। কৃষকদের পরিবার ও জনসমাজের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াতে শুধু ২০১৯ সালে আমরা ২২৫,০০০ কৃষককে নতুন প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করেছি।

সমুদ্র নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ ও মানব পাচার প্রতিরোধ থেকে শুরু করে নারীদেরসহ সকলের মাঝে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত ( STEM)  বিষয়ক শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং উচ্চ শিক্ষা খাতকে শক্তিশালী করা পর্যন্ত সমস্ত ক্ষেত্রে আমরা অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছি।

দশ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয়দানের জন্য আমরা বাংলাদেশের অব্যাহত উদারতার প্রশংসা করি। বাংলাদেশের আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক ত্রাণ সহায়তা প্রদানে শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক দাতাদেশ হিসাবে এই সংকটের একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে যুক্তরাষ্ট্র আপনাদের অবিচল সহযোগী হিসেবে থাকবে।

কোভিড-১৯’র প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আমাদের কয়েক দশকের অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। আমেরিকার সম্মুখসারির কর্মীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ উৎপাদনে গতি সৃষ্টির জন্য আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। গত বছর মার্চ মাসের পর থেকে বাংলাদেশের কোভিড-১৯ মোকাবেলা কার্যক্রমে সহায়তা হিসেবে আমেরিকায় উৎপাদিত ১০০টি উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন ভেন্টিলেটর ও গ্যাস অ্যানালাইজারসহ যুক্তরাষ্ট্র ৭৩ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে। এসব সহায়তার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে জীবন বাঁচানোর সক্ষমতার পাশাপাশি দেশের সকল ভেন্টিলেটরের কার্যকারিতার সনদায়ন ও পুনঃপরীক্ষাসহ স্থানীয়ভাবে ভেন্টিলেটর উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশেসহ বিশ্বব্যাপী নিরাপদ ও কার্যকর কোভিড-১৯’র টীকা বিতরণ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কোভ্যাক্স কার্যক্রমে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে। এর আওতায় আগামী জুনের মধ্যে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে আনুমানিক ১ কোটি ৯ লক্ষ ডোজ টীকা পাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে পেরেও আমরা গর্বিত। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ৫০০’রও বেশি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে আমরা স্থানীয় জনসমাজের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সহিষ্ণুতা জোরদার করেছি। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে ৯০০,০০০ মানুষের জীবন সুরক্ষায় সহায়ক হবে। আরো কার্যকরী ও দূষণমুক্ত জ্বালানী উৎপাদনের মাধ্যমে কার্বন নির্গমন কমাতে বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত প্রচেষ্টাগুলোতে আমরা সমর্থন জানাই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে আমরা বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানী উৎসের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছি যা বাংলাদেশের জ্বালানী প্রেক্ষাপট পরিবর্তনে সহায়ক হবে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি রয়েছে এমন দেশগুলোর পক্ষে বাংলাদেশের জনমত গঠন ও পদক্ষেপ গ্রহণকে আমরা সমর্থন করি এবং এজন্য আমরা বাংলাদেশকে সাধুবাদ জানাই। ৫০তম বার্ষিকী উদযাপনে জলবায়ু বিষয়ে বাংলাদেশের এই নেতৃত্বদান বৈদেশিক নীতি বিষয়ক অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি পাবার দাবি রাখে।

গত তিন বছর ধরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিকাশমান অংশীদারিত্বের অংশ হতে পেরে আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান বলে মনে করি। আমি বাংলাদেশীদের দৃঢ়সংকল্প ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা, আমাদের বিকাশমান সম্পর্কের গতিশীলতা এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতির সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য দ্বারা সর্বদা অনুপ্রাণিত হয়েছি। দেশটি সত্যিকার অর্থেই এক সোনার বাংলা।

আমরা দুই দেশ আগামী পঞ্চাশ বছর বা আরো সামনে তাকিয়ে দেখতে চাই, আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে আরো নিখুঁত করে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, বৈষম্য ও অসম আচরণ দূর করা, ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবাধিকার উৎসাহিত করাসহ আমাদের সকল নাগরিকের জন্য সম্মিলিত সমৃদ্ধি অর্জনে আমরা একসাথে কাজ করবো।

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মীদলের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশের বহু অসামান্য অর্জন উদযাপনের সাথে সাথে আমরা এদেশের আরো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছি।

অনেক ধন্যবাদ।