Flag

An official website of the United States government

মানবাধিকার দিবসের সম্মানে: সর্বজনীন স্বাধীনতার সুরক্ষায় যৌথ দায়িত্ব
দ্বারা
2 পড়ার সময়
ডিসেম্বর 10, 2022

 

লিখেছেন: পিটার হাস, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত
ডিসেম্বর ১০, ২০২২

চুয়াত্তর বছর আগে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পরপর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়েছিল; এবং তাতে একটি নীতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছিল: মানবাধিকার সর্বজনীন। জাতীয়তা, বর্ণ, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, ধর্ম ও বয়স নির্বিশেষে সকল মানুষ এই অধিকারগুলো পাবে; প্রত্যেকে, সবসময় ও সব জায়গায়।

আজ, সর্বজনীন মানবাধিকারের ভিত্তিতে গড়ে উঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বিপদাপন্ন বা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আগ্রাসী যুদ্ধে ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য অংশের শান্তি ও কল্যাণ হুমকির মুখে পড়েছে। একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচার মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে খর্ব করছে। কোভিড-১৯ মহামারি ও জলবায়ু পরিবর্তন এই চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের মানুষ অব্যাহতভাবে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরির সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

আমার বিশ্বাস করি আশান্বিত হওয়ার মতোও  যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মানবাধিকার রক্ষাকর্মী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের অন্যান্য সদস্যরা আগামী প্রজন্মের জন্য আরো মুক্ত ও আরো ন্যায়সঙ্গত পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন । তারা নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করতে, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে, দুর্নীতির ঘটনা জনসমক্ষে আনতে, অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্যকে উন্নীত করতে এবং ন্যায়বিচার পাওয়া নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। আজ, আমরা তাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান উদযাপন করছি।

যুক্তরাষ্ট্রে অধিকার রক্ষাকর্মীরা সমাজের অসমতা দূর করতে সংগ্রাম করছেন। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা যায়। ১৯৭৭ সালে ১৫০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সান ফ্রান্সিসকো-র একটি ফেডারেল ভবনে অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা বৈষম্য দূর করতে ও চাকরি, পরিবহন ও শিক্ষায় সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবী জানাতে এটি করেছিলেন। দীর্ঘ সংগ্রামের অংশ হিসেবে তারা এই কাজটি করেছিলেন। তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ তাদের সেই অধিকার আন্দোলনের ফলে আজ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও রূপান্তরমূলক সমাধানের মধ্য দিয়ে অন্যদের কাছে আদর্শ হয়ে উঠেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বজনীন মানবাধিকার নিশ্চিত করার লড়াই অব্যাহত রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা পুলিশের জবাবদিহিতা ও ভোটাধিকার সুরক্ষার জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছে।

আমার বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারকারী নাগরিক সমাজের সাহসী সদস্যদের সাথে পরিচিত  হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন তিনজন ব্যক্তিত্বকে এ বছর সম্মানিত করতে পেরে গর্বিত। তাদের একজন হলেন পরিবেশগত ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইকারী রিজওয়ানা হাসান, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ  স্টেট গত মার্চ মাসে একজন আন্তর্জাতিক সাহসী নারী (ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অফ কারেজ) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তরিকুল ইসলাম পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের সহায়তা করা ও পাচারকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য জুলাই মাসে মানব পাচার বিরোধী হিরো (এন্টি-ট্রাফিকিং ইন পারসনস হিরো) উপাধি পেয়েছেন। এবং গতকাল রোজিনা ইসলাম দুর্নীতি ও অপব্যবহারের বিষয়গুলো জনসম্মুখে তুলে ধরার জন্য দুর্নীতি বিরোধী চ্যাম্পিয়ান (এন্টি-করাপসন চ্যাম্পিয়ান) সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। মানবাধিকার দিবসে আমরা তাদের ও অন্য আরো অনেকের নিবেদিত ও অনুপ্রেরণামূলক কাজ উদযাপন করছি।

প্রতিটি দেশে মানবাধিকার রক্ষাকর্মীদের সোচ্চার হওয়া সরকারকে সর্বজনীন মানবাধিকারের অধীনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই সকল সাহসী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে প্রায়ই ভয়, হুমকি, নির্বিচারে আটক, জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা, অনলাইনে দেয়া বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এমন আইনের অধীনে অন্যায় অভিযোগ ও অন্যায্য বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। ২০২১ সালে এনজিওগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, বিশ্বব্যাপী ৩০০ এরও বেশি মানবাধিকার রক্ষাকর্মী ও ৫০ এর বেশি গণমাধ্যম কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে এবং আরো কয়েকশ ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। এই ধরনের দমন-পীড়ন যেখানেই ঘটুক না কেন তা নিন্দনীয়।

আমি বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। যুক্তরাষ্ট্র ঢাকায় ভীতি প্রদর্শন ও রাজনৈতিক সহিংসতার খবরে উদ্বিগ্ন এবং সকল বাংলাদেশিকে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং সহিংসতা, হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।  আমরা সরকারী কর্তৃপক্ষকে সহিংসতার এই প্রতিবেদনগুলি তদন্ত করার এবং মত প্রকাশের মৌলিক স্বাধীনতা, সমিতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সুরক্ষার জন্য আহ্বান জানাই।

যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ – উভয় দেশেই এখনো অনেক কাজ বাকি। যুক্তরাষ্ট্র সর্বজনীন মানবাধিকারকে সমর্থন করা অব্যাহত রাখবে। আমরা স্বাধীনতাকামী ও মর্যাদার দাবীদার ব্যক্তিদের সাথে সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি নিজ  দেশে আইনের অধীনে সাম্য ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাব। আমরা আমাদের নিজেদের ঘাটতিগুলো সমাধানে ও আরো ভালো কিছু করার জন্য গুরুত্বসহকারে আমাদের দায়িত্ব পালন করব। আমরা আশা করি অন্য দেশগুলোও একইভাবে তাদের কাজগুলো করবে। মানবাধিকারের সর্বজনীনতার অর্থই হলো আমরা অবশ্যই নিজেদেরকেও একই মানদণ্ডের কাছে জবাবদিহিতার জন্য প্রস্তুত থাকব। মানবাধিকার দিবস আমাদেরকে সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের প্রত্যেকেরই মানবাধিকার সমুন্নত রাখার দায়িত্ব রয়েছে।